সোমবার, ০৮ Jun ২০২৬, ০৯:২০ পূর্বাহ্ন
নিত্যানন্দ হালদার,মাদারীপুরঃ মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী মহামানব শ্রীশ্রী গণেশ পাগল সেবাশ্রম সংঘের ঐতিহ্যবাহী কুম্ভ মেলায় ভক্ত সংঘের উদ্যোগে বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য সেবা ক্যাম্প,ঔষুধ তিরণ,সুপেয় জল,সরবত,বাতাসা,প্রসাদ বিতরণ ও ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করায় আগত ভক্তদের প্রশংসা কুড়িয়েছে ভক্ত সংঘ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটি মাদারীপুর জেলা শাখা। সেবা ক্যাম্পের উদ্বোধন করেন দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস।

জানা যায়,হিন্দু ধর্মাম্বলীদের শাস্ত্রমতে সত্য যুগে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে সমুদ্র মন্থনে যে অমৃত সুধা উঠেছিল তা চারটি কুম্ভ পাত্রে হরিদ্বার,প্রয়াগ,উজ্জয়িনী ও নাসিক এ চারটি স্থানে রাখা হয়েছিল। এ ঘটনার পর থেকে ভারতীয় মুনি ঋষিরা কুম্ভ মেলার আয়োজন করে আসছেন। প্রায় দেড় শত বছর পূর্বে জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৩ তারিখ ১৩ জন সাধু ১৩ সের চাল,১৩টি কড়ি ও ১৩ টাকা নিয়ে রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ীর দীঘিরপাড় ভারতের কুম্ভমেলাকে অনুসরণ করে এ মেলার আয়োজন করেন। সেই থেকে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ীর দীঘিরপাড় মহামানব শ্রীশ্রী গনেশ পাগল সেবাশ্রমে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এক রাতের মেলা হলেও এ মেলা চলে সপ্তাহ ব্যাপী। প্রায় ১৫ থেকে ২০ লক্ষাধিক ভক্তবৃন্দের উপস্থিতি ঘটে এ কুম্ভমেলা বা কামনার মেলায়। বুধবার সকাল থেকেই দলে দলে জয় ডংকা ও নানা রকমের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে জয় হরিবল ও জয়বাবা গনেশ পাগল ধ্বণি করতে করতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাধু সন্যাসী ও ভক্তবৃন্দরা বাসে, ট্রাকে, ট্রলারে ও পদব্রজে মেলা প্রাঙ্গণে আসতে শুরু করেন। খুলনা,বরিশাল,পিরোজপুর,ঝালকাঠি,পটুয়াখালী,সাতক্ষীরা,রাজশাহী,বগুড়া,চিটাগং,রংপুর,যশোর,খুল,ফরিদপুর,রাজবাড়ী,নারায়নগঞ্জ,েেগাপালগঞ্জ,গৌরনদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দলে দলে মানুষ আসে।এছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত,নেপাল,শ্রীলঙ্কা ও অন্যান্য রাষ্ট্র থেকেও বহু ভক্তবৃন্দ আসে ঐতিহ্যবাহী এ কামনার মেলায়। এ মেলায় আসা হাজার হাজার সাধু সন্ন্যাসী ও আর ভক্তরা একতারা আর দোতারায় সুর দিয়ে সারা রাত মাতিয়ে তুলেন। আয়োজন করা হয় ছোট বড় অর্ধশতাধিক প্যান্ডেলে বাউল ও ধর্মীয় সঙ্গীতানুষ্ঠানের। গভীর রাত পর্যন্ত চলে অর্ধ লক্ষাধিক ভক্তদের মধ্যে কয়েকটি ভক্তসেবা কমিটির প্রসাদ বিতরন।

মহামানব গণেশ পাগল সেবাশ্রম সংঘের ঐতিহ্যবাহী কুম্ভমেলায় ভক্ত সংঘ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটি মাদারীপুর জেলা শাখার উদ্যোগে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। ক্যাম্পের কার্যক্রম শুরু হয় ২৭মে বুধবার রাত থেকে।বৃহস্পতিবার সকাল থেকে হাজার হাজার আগত ভক্তদের মধ্যে সরবত,বিশুদ্ধ জল,বাতাসা(মিষ্টি) ও প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এছাড়াও অসুস্থ রোগীদের সেবায় ভক্ত সংঘের চারজন চিকিৎসক সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সার্বক্ষণিক বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও ঔষধ বিতরণ করেন। ২৮মে বৃহস্পতিবার সকালে সেবা ক্যাম্পের শুভ উদ্বোধন করেন দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস। এছাড়াও সেবা ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে সংগঠনের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ও প্রশংসা করেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট ভাগবত পাঠক গোপীনাথ দাস ব্রহ্মচারী, মাদারীপুর সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিশ্বজিৎ বেদ্য নাদিম,মাদারীপুর সরকারি কলেজের অধ্যাপক বেদানন্দ হালদার,মাদারীপুর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক প্রানতোষ মন্ডল,গোপালগঞ্জের কর্ণ কুসুম মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ স্মৃতি কণা বাকচী,কুম্ভমেলা কমিটির আহবায়ক জীবন বোস,কমিটির সাবেক সভাপতি মিরন বিশ্বাস, প্রণব বিশ্বাস,খুলনার লোক কবি আনন্দ সরকার, লোক কবি অপূর্ব লাল সরকার,শরীয়তপুরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী চন্দন দেবনাথ।

ভক্ত সংঘ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটি মাদারীপুর জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক নিত্যানন্দ হালদারের সভাপতিত্বে ও জেলা শাখার সাধারন সম্পাদক উত্তম কুমার বাগচীর অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় সেবা ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখেন ভক্ত সংঘ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান উপদেষ্টা সুনিল বালা,সভাপতি শান্তি রঞ্জণ মন্ডল,সাংগঠনিক সম্পাদক পলাশ মল্লিক,সহপতি নিতাই সূত্রধর,উপদেষ্টা পল্টুরঞ্জন দোকানী,বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী অনিমা বাইন প্রমুখ। বক্তারা তাদের বক্তব্যে মহামানব গণেশ পাগল সেবাশ্রম সংঘে উপস্থিত লাখো ভক্তদের সেবায় ভক্ত সংঘ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটি মাদারীপুর জেলা শাখা যে অবদান রেখেছে,এতে সেবা প্রার্থীরা খুবই খুশি হয়েছেন। একটি অরাজনৈতিক ও ধর্মীয় সেবামুলক সংগঠন ভক্ত সংঘ আগামীতে আরো বেশি বেশি সেবামূলক কার্যক্রম পরিচলনা করবে এমনটাই প্রতাশা করেন বক্তারা।ভক্ত সংঘের শতাধিক সদস্য রাত দিন ২৪ ঘন্টা নিজেদেরকে সেবামুলক কাজে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করেন। ভক্ত সংঘের শিল্পীরা সারারাত ধর্মীয় সংগীতের মধ্যে দিয়ে ভক্তদের মাতিয়ে তুলেন।
এ মেলা উপলক্ষে প্রায় ৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসেছে সারি সারি নানা রকমের দোকান। দেশ বিদেশ থেকে আসা এসব সাধু সন্ন্যাসী ও ভক্তরা ১০৮টি মন্দির দর্শন,প্রার্থনা,আরাধনা,পূজা-অর্চণা,ধর্মীয় সঙ্গীত,নৃত্য-বাদ্য বাজনা পরিবেশনের মধ্য দিয়ে রাত অতিবাহিত করেন। এ মেলা উপলক্ষে ৭ দিন পুর্ব থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসে দোকানিরা।বাঁশ বেতের শিল্প কারু কাজ খচিত গৃহস্থালী মালামাল,মৃৎ শিল্প বা মাটির তৈরী তৈজসপত্র,বাহারী মিষ্টি,দৃষ্টি আকর্ষনীয় খেলনা ও বাহারী প্রসাধণী পণ্য দিয়ে সাজিয়ে বসছে কমপক্ষে সহস্রাধিক বিভিন্ন ধরনের স্টল।তবে বেশী ভীড় জমে মিষ্টির দোকান ও হোটেলে।
মেলা কমিটির আহবায়ক জীবন বোস জানান,কুম্ভমেলা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে মেলা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় মেলা কমিটির আহবায়ক প্রশাসনসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানান। আহবায়ক আরো বলেন,অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর বেশি ভক্তের উপস্থিতি হয়েছে।আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০ মে মেলার সমাপ্তি ঘোষনা করা হয়েছে। তারপরও ব্যবসায়ীরা কেউ দুই এক দিন থাকতে চাইলে সেটা তাদের ব্যাপার।