বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ০১:৫৪ পূর্বাহ্ন
নিত্যানন্দ হালদার,মাদারীপুর: ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী কালী পূজা ও পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী মহামানব শ্রীশ্রী গনেশ পাগল সেবাশ্রম সংঘ ও খালিয়ার সেনদিয়ায় শুরু হয়েছে সপ্তাহ ব্যাপী কবি গান ও পক্ষকাল ব্যাপী পৌষ মেলা।কবি গান শুনতে এবং পৌষ মেলায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতাদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে উঠছে মেলা প্রাঙ্গণ। গভীর রাত পর্যন্ত চলছে গান ও মেলা। মেলায় কোন চাঁদাবাজী ও বখাটেদের কোন উৎপাত না থাকায় দর্শনার্থী,ক্রেতা ও বিক্রেতা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তারা। কবিগান ও ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলা যুগ যুগ টিকিয়ে রাখতে আয়োজকরা বদ্ধ পরিকর।
জানা গেছে, শত বছর পূর্বে মহামানব শ্রীশ্রী গনেশ পাগল পৌষ মাসের শেষ মঙ্গলবার শ্রীশ্রী কালী পূজার মধ্যে দিয়ে কবি গানের আয়োজন করেছিলেন এবং নিজে ঈশান কোনের আসরে বসে কবিগান শ্রবণ করেছিলেন। সেই থেকে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী মহামানব শ্রীশ্রী গনেশ পাগল সেবাশ্রম সংঘে প্রতি বছর ১৫ জানুয়ারী থেকে ২১ জানুয়ারী পর্যন্ত ৭ দিন ব্যাপী কবিগানের আয়োজন করা হয়। বসে ১৫ দিন ব্যাপী পৌষ মেলা।কদমবাড়ীর ৭ দিন ব্যাপী কবি গানে এ বছর বাংলাদেশ চারণ কবি সংঘের সহ-সভাপতি কবি স্বপন সরকার, কবি তিমির সরকার,কবি স¤্রাট সরকার,কবি অপূর্ব লাল সরকার,কবি সুরেশ সরকার,কবি সঞ্জয় সরকারসহ বেশ কয়েকজন কবিয়াল ও কবিয়ালবৃন্দ অংশ গ্রহন করছেন। এ উপলক্ষে কদমবাড়ীতে বসছে পক্ষকাল ব্যাপী পৌষ মেলা। মেলায় ৫ শতাধিক বিভিন্ন ধরনের স্টল বসছে।মেলায় বিকিকিনিও ভাল হচ্ছে। গভীর রাত পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। মেলায় কোন চাঁদাবাজী ও বখাটেদের কোন উৎপাত না থাকায় দর্শনার্থী,ক্রেতা ও বিক্রেতা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তারা।
মহামানব শ্রীশ্রী গনেশ পাগল সেবাশ্রমে কবিগানে অংশ গ্রহন করা প্রখ্যাত কবিয়াল স্বপন সরকার ও তিমির সরকারের কাছে কবিগান নিয়ে কথা হলে তারা জানান,কবিগান মানুষের মধ্যে আত্মচেতনা প্রস্ফুটিত করে,কবিগানের ভিতরে প্রেম পবিত্রতা ফুটে উঠে,আধ্যাত্মিক চেতনা ফুটে উঠে,বিশ^ মানবতা ফুটে উঠে,মানুষের মধ্যে থেকে হিংসা,নিন্দা দূরীভূত হয়,মানুষের মধ্যে এমন প্রেম জাগরিত হয় যে কবিগানের ভিতরে একজন আরেকজনকে ধরে ভাব ভক্তিতে আলিঙ্গন করে। কবিগানের মধ্যে দিয়ে মানুষকে সৎ পথে আনার দৃঢ প্রত্যয় ব্যক্ত করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিশ^ মানবতার জন্য কবিগান গেয়ে যাওয়ার কথা বললেন প্রখ্যাত দুই কবি।
এ দিকে একই উপজেলার খালিয়ার সেনদিয়ায়ও শ্রীশ্রী কৃষ্ণকালি পূজা ও পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে শুরু হয়েছে ৫দিন ব্যাপী কবি গান ও পক্ষকাল ব্যাপী পৌষ মেলা। প্রায় ৩শ বছরেরও অধিক সময় ধরে সেনদিয়ার কৃষ্ণকালি মন্দির প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ৫দিন ব্যাপী কবি গানের আসর। এ বছর কবি গানে অংশ গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশ চারণ কবি সংঘের সদস্য প্রখ্যাত কবিয়াল সুরেশ সরকার,কবি সঞ্জয় সরকার ও সহশিল্পীবৃন্দ। মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ জেলাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার হাজার হাজার মানুষ গভীর রাত পর্যন্ত কবি গান শ্রবণ করতে আসেন। এ উপলক্ষে ১৫ দিন ব্যাপী বসছে পৌষ মেলা। এ মেলাও প্রায় ৫ শতাধিক বিভিন্ন ধরনের স্টল বসছে। অতিত ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মেলা কমিটি।দুই মেলায় কবি গান শুনতে আসা শ্রোতারা কবিগানকে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখার অনুরোধ জানালেন এবং মেলায় আসা দর্শণার্থীরা জানালেন তাদের অনুভূতি।
কদমবাড়ী মহামানব শ্রী শ্রী গনেশ পাগল সেবাশ্রম সংঘে কবি গান শুনতে আসা চিনে গবেষনায় নিয়োজিত গোপালগঞ্জের ড.শুভ মন্ডল ও তার সহধর্মীনি সেতু বিশ^াস জানান,মহামানব গনেশ পাগল সেবাশ্রম সংঘের ঐতিহ্যবাহী কবিগান ও পৌষমেলায় আসার জন্য তার একটি বছর অপেক্ষায় ছিলেন। তারা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলা ঘুরে দেখছেন এবং কেনাকাটা করেছেন। এছাড়াও তারা কবির আসওে কবিগানও শ্রবন করেছেন বলে জানান। মেলা এবং কবিগান তাদের খুব ভালো লেগেছে।
গোপালগঞ্জের অধ্যাপক নীতিশ চন্দ্র দাস জানান,কবিগান শ্রবণ করা মানে আধ্যাত্মিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। তাই মানুষকে সৎ পথে আনার জন্য মাঝে মধ্যে কবি গান শ্রবণ করা উচিৎ বলে তিনি মনে করেন।
কদমবাড়ী শ্রীশ্রী গনেশ পাগল সেবাশ্রম সংঘের অধ্যক্ষ অতুল গোস্বামী জানান,মহামানব গনেশ পাগল নিজেই এক শত বছর পূর্বে শ্রীশ্রী কালিমাতার পূজা করেছিলেন এবং কবিগানেরও আয়োজন করে গেছেন। তিনি নিজে আসরের ঈশান কোনে বসে কবি গান শ্রবণ করতেন।সেই থেকে কবিগান ও পৌষ মেলা চলে আসছে। পাগলের নিজের দেওয়া কবিগান ও মেলার ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য সকলের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান অধ্যক্ষ অতুল গোস্বামী।
কদমবাড়ী মহামানব শ্রীশ্রী গনেশ পাগল সেবাশ্রম সংঘ ও পৌষ মেলা কমিটির সভাপতি মিরন বিশ^াস জানান,লোক সাহিত্য চারণ কবিদের যে কবিগান, এ কবিগান এখানকার ঐতিহ্য। বাংলাদেশের খ্যাতনামা কবি স¤্রাট রাজেন সরকার,কবি বিজয় সরকার,কবি রশিক সরকার,কবি অসিম সরকার,কবি নকুল সরকার, কবি অনাদি সরকার,কবি নিশিকান্ত সরকারসহ অসংখ্য কবিয়ালবৃন্দ এ কদমবাড়ীর এ আসরে কবিগান গেয়েছেন।এই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য মেলা কমিটির সদস্যবৃন্দ আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সেনদিয়া মেলা উদযাপন কমিটির সভাপতি খোকন মন্ডল জানান,সেনদিয়া পশ্চিমপাড়া মাঠে প্রায় ৩শত বছর যাবৎ মেলা ও কবিগান চলে আসছে।বড় বড় নামি দামি কবিরা এ মাঠে কবিগান পরিবেশন করেছেন এবং করছেন। আমরা সবাই মিলে এখানকার ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য বদ্ধপরিকর।
কদমবাড়ী ও খালিয়ার কবি গান এবং পৌষ মেলার ঐতিহ্য ধরে রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন এলাকার সর্বস্তরের জনগন।